মানুষ বিচার চায় না কেন? – জায়েদুল আহসান পিন্টু

মানুষ বিচার চায় না কেন? শিরনামে বিশিষ্ট সাংবাদিক জায়েদুল আহসান পিন্টু তার ফেসবুক স্টাটাসে লিখেছেন:

মানুষ বিচার চায় না কেন? - জায়েদুল আহসান পিন্টু
জায়েদুল আহসান পিন্টু

১. বেশ ক’বছর ধরে শুনছি বিচারহীনতার সংস্কৃতির কথা। শুনতে শুনতে ক্লিশে হয়ে গেছে শব্দটা। সুশীল সমাজ আর বিরোধী পক্ষ অনেকদিন ধরেই একথা বলছে। আর আজকাল সাধারণ নাগরিকদের কেউ কেউ বিচারই চাইছেন না। তারা বলছেন বিচার চেয়ে কী হবে। সাধারণ নাগরকিদের মনের এই ভাবনা উদ্বেগেরই না। রীতিমত ভয়ানক ভবিষ্যতের ঈঙ্গিত দেয়।

২. তার মানে কি দেশে বিচার হচ্ছে না? বিচার চেয়ে পাওয়া যাচ্ছে না? বিষয়টা কি সত্যি তাই? আমরাতো দেখছি গড়ে প্র্রতিদিন একজন করে মানুষের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হচ্ছে। এখনো কারাগারের কনডেমড সেলে দুই হাজারেরও বেশি আসামী মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে বন্দি আছে। প্রতিদিন সারাদেশে বিচারকরা শত শত রায় দিচ্ছেন। তাহলে বিচারটা হচ্ছে না বা পাচ্ছি না বলছি কেন? উত্তরটা খোঁজার চেষ্টা করা যাক।

[ মানুষ বিচার চায় না কেন? – জায়েদুল আহসান পিন্টু ]

৩. বিচার বিভাগ যে বছর নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা হয় সেবছর অর্থাৎ ২০০৭ সালে দেশে বিচারাধীন মামলা ছিল ১৫ লাখের একটু বেশি। আর বর্তমানে দেশে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৪০ লাখের কাছাকাছি। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২ লাখ অনিষ্পন্ন মামলা যুক্ত হচ্ছে। বিষয়টা অনেকটা বানরের পিচ্ছিল বাশ বেয়ে ওপরে উঠার মতো। ১০টা নতুন মামলা হলে ৮টার নিষ্পত্তি হয়। ২টা জমে যায়। পরের বার ১১টা মামলা হলে ৮ নিস্পত্তি হয় জমে যায় আরো ৩টা। সাথে পুরানো ২টাতো আছেই। এভাবে জমতে জমতে ১৫ বছরে ২৫ লাখ মামলা যুক্ত হয়ে এখন ৪০ লাখ হয়েছে।

৪. দেশে প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য বিচারক একজন। তার মাথায় ২০০০ মামলা। এসব তথ্য আমরা সবাই জানি। সংসদে প্রায় প্রতি অধিবেশনেই কোন না সাংসদ এই প্রশ্নটি করেন। আর আইনমন্ত্রী মামলা জটের হিসাব দেন। পাশাপাশি এটাও বলেন, বিচারাধীন মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সরকার নানামুখী কার্যক্রম নিয়েছে। বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি, নতুন আদালত গঠন, আদালতের অবকাঠামো উন্নয়ন, বিচারকদের প্রশিক্ষণসহ মামলা নিষ্পত্তিতে তদারকি বাড়াতে সরকারের নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। আইনমন্ত্রীদেরও এসব প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ হয়ে গেছে।

৫. সরকারগুলো কী যে পদক্ষেপ নিয়েছে/নিচ্ছে তাতো দেশবাসী দেখতেই পাচ্ছে। আমারতো মনে হয় স্বাধীনতার ৫০ বছরে এই একটি মন্ত্রণালয় তেমন কোন কাজই করেনি। দেশের ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমে যে আমূল পরিবর্তন আনা দরকার সেটা কেউই করেননি। সবাই শুধু বক্তৃতা দিয়ে যাচ্ছেন। আর এ কারণেই দেশের নাগরিকদের বিশাল একটা অংশ ক্রসফায়ারের পক্ষে কথা বলেন। কিছুদিন আগ পর্যন্ত সরকারগুলোও ক্রসফায়ারের পক্ষে ছিল। যার অর্থ হলো বিচারে আস্থা নেই। এই আস্থাহীনতা একটা সময় অরাজকর পরিস্থিতির জন্ম দিবে কোন সন্দেহ নেই।

৬. গত বছর এক ভার্চুয়াল শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে বলতে হয়েছিল, ‘বিচার বিভাগ পৃথককরণ হয়েছে ২০০৭ সালে, আজ ২০২১ সালেও চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট ভবনের জন্য সব জায়গা অধিগ্রহণ হয়নি, তারপর বিল্ডিং করতে হবে। আমি আর কত বলবো?’ তাইতো প্রধান বিচারপতি আর কত বলবেন?

৭. তবে আমি বলি ভিন্ন কথা। শুধু অবকাঠামোগত সুবিধা বাড়ালেই বিচারের জট কমবে না। পাশাপাশি কমাতে হবে মামলার উৎপত্তিস্থল। মামলা সৃষ্টির কারণ বন্ধ করতে হবে। আর সেজন্য দরকার প্রতিটি ক্ষেত্রে সুশাসন।

৮. হ্যা, এটা ঠিক বিচারকের সঙ্কট তাৎক্ষণিকভাবে মিটানো সম্ভব না। তাই বলে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা থাকবে না? কিছুই যদি না পারেন অবসরপ্রাপ্ত জজদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগতো দিতে পারতেন। আমলাদেরতো চুক্তিতে নিয়োগ দিতে কার্পণ্য করতে দেখি না।

৯. শুরুতে বলেছিলাম, বিচারের রায় হতে দেখি প্রতিদিন। কিন্তু যেটা দেখি না সেটা হলো রায় কার্যকর হওয়া। আবার যেটা ভাইরাল হয় না সেটার খবর রাখি না। আর বলছিলাম ফাঁসির আদেশ নিয়ে বন্দি আছে দুই হাজারেরও বেশি। হিসেব করে দেখা গেছে ২০-২৫ বছর লাগে একটি খুনের মামলার চুড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে। রায় পেতে যদি দুই যুগ লেগে যায় বিচারের কী দরকার। বিচার হয় কেন? সমাজে যেন অপরাধ না বাড়ে। কিন্তু বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় বিচারের রায়ের কোন প্রভাবই নেই সমাজে। যে কারণে আজ দেশের মানুষ মূখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। নীতি নির্ধারকরা এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারছেন না তাতো নয়। কিন্তু কার্যকর কোন উদ্যোগ নেই কেন?

১০. এবার একটি পুরানো গল্প নতুন করে বলি। বিচারক কাঠগড়ায় দাঁড়ানো এক বৃদ্ধ আসামীকে তিরস্কার করে বলছেন, আপনার মতো সিনিয়র সিটিজেন এক তরুনীর দিকে কুদৃষ্টি দিলেন কী করে? সমাজ আপনাদের কাছ থেকে কী শিখবে? তরুণ বয়স হলেও বুঝতাম বয়সের দোষ! জবাবে ওই বৃদ্ধ বলছেন, মাই লর্ড, ঘটনাটা তিন যুগ আগের, তখন আমার কাঁচা বয়সই ছিল, ওই যে দেখছেন না মামলার বাদিনী তার নাতি নাতনি নিয়ে শুনানিতে অংশ নিতে আসছেন।

১১. উপরের গল্পটা রুপক হলেও এবার একটা আসল খবর দেই। একটা সংবাদ দেখেছিলাম মাস দুয়েক আগে। চ্যানেল ২৪ এ। খবরটা এরকম: ২০১০ সালে বগুড়ায় আড়াই হাজার টাকা ঘুষসহ হাতেনাতে ধরা পড়েন সরকারি এক প্রকৌশলী। দুদক মামলা করলো তার নামে। ২০১৩ সালে আদালত তাকে দুই বছরের সাজা দেয়। তিন বছর পর তাকে খালাস দেয় হাইকোর্ট। মামলা যায় আপিল বিভাগে। সেই আপিল নিষ্পত্তি হয় চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে। দণ্ডাদেশ বহাল থাকে। ২৫০০ টাকার এই দুর্নীতি মামলা নিষ্পত্তিতে দুদকের খরচ হয়েছে ৬ লাখ টাকা। সময় লেগেছে এক যুগ। আসামি কিন্তু লাপাত্তা।

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন